পাহাড়ের চূড়ায় আলো

এক পাশে কুয়াশা, আরেক পাশ দিয়ে সূর্যের আলো এসে জড়িয়ে ধরেছে পাহাড়টিকে। রোদ আর কুয়াশার লুকোচুরির পথ ধরে হেঁটে যায় শতাধিক শিশু-কিশোর। তারা হাঁটতে হাঁটতে বলতে থাকেÑ ‘সুস্থ দেহ, প্রশান্ত মন, কর্মব্যস্ত সুখী জীবন’। অন্য পাশ থেকে অন্য একটি দল হাঁটছে আর বলছে, ‘আমি পারি, আমি করব, আমার জীবন আমি গড়ব’। ওরা কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠান কোয়ান্টাম কসমো স্কুলের মেধাবী শিক্ষার্থী। এটা বান্দরবানের সরই ও লামার দুর্গম পাহাড়ে অবস্থিত।
কসমো স্কুলে অসহায় ও বঞ্চিত শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক শিক্ষা দিয়ে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। শুধু শীতে নয়, বছরের বারো মাসই এভাবে ঠিক ভোর ৫টায় ঘুম ভাঙে তাদের। এরপর রাত ১০টা পর্যন্ত প্রতিদিন চলে তারা একই নিয়মে। সময়ের এ মূল্যায়ন করেছে বলেই মাত্র সাত শিশু নিয়ে শুরু হওয়া কোয়ান্টাম কসমো স্কুল অ্যান্ড কলেজের বর্তমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৭ শতাধিক। মাত্র ১৭ বছরে এ প্রতিষ্ঠানের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। সম্প্রতি এ শিক্ষা কার্যক্রমের সাফল্যের ধারাবাহিকতার কথা শুনে তা দেখতে গিয়ে এমপি নুরুল ইসলাম ওমর জানান, সত্যি তিনি হতবাক পাহাড়ে এসে এ সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কার্যক্রম দেখে। দুর্গম পাহাড়ে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন যে কার্যক্রম করছে, তা অবশ্যই ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। দুই দিন তাদের কাছাকাছি থেকে যা দেখলেম, তাতে মনে হচ্ছে, এরাই আগামী বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে। এরাই একদিন একটি মানবিক ও উন্নয়নশীল বাংলাদেশ গড়বে। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গর্ববোধ করছেন এ দুর্গম পাহাড়ে যে আলোকবর্তিকা হচ্ছে, তা দেখতে পেরে। কথা হয় অর্গানিয়ার অধ্যক্ষ ছালেহ আহমেদের সঙ্গে। জানতে চাওয়া হয় এ প্রতিষ্ঠান কীভাবে সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করছে। তিনি জানান, এখানে শিশুদের চেতনা ও মানবিকতার শিক্ষাটা বেশি দেওয়া হয়। এ শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে তারা ধারাবাহিকভাবে সাফল্য লাভ করছে। সাত শিশু নিয়ে শিক্ষা র্কাযক্রমে প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু করে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৭ শতাধিক।
সরেজমিন দেখা গেছে, দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় এ প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে একটি আলোকিত জনপদ। চেতনা ও মানবিক শিক্ষা দিয়ে যে একটি সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়া যায়, তা প্রমাণ করেছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন। কোনো সরকারি বা বেসরকরি সাহায্য ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটি এখন পাহাড়ের চূড়ার আলোকবর্তিকা। বর্তমানে এখানে রয়েছে ২০ জাতিগোষ্ঠীর মেয়ে ও ছেলেশিশু। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ আল বোখারী মহাজাতক ২০০১ সালে সরই, লামা ও বান্দরবানে সাত শিশু নিয়ে শুরু করেন এর শিক্ষা কার্যক্রম। এরপর ধারাবাহিক সাফল্য শিক্ষা, ক্রীড়া থেকে শুরু করে সব অঙ্গনে। শিশু থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী রয়েছে এ প্রতিষ্ঠানে। বাঙালি ছাড়াও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, চাকমা মার্মা তঞ্চঙ্গ্যা, বম, পাংখোয়া, মুরুং, সাঁওতাল, ত্রিপুরা, খিয়াং, গারো খুমী, রাখাইন, বড়–য়া, চাক, কড়া, উরাও, মুন্ডা, লুসাই, খিয়াও তেলেগু লেখাপড়া করে এ প্রতিষ্ঠানে। তাদের ধর্ম ইসলাম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, সনাতন, ক্রামা, প্রকৃতিপূজারি। সব ধর্মের শিশুই যার যার ধর্ম পালন করছে; আর একসঙ্গে গড়ে উঠছে আলোকিত মানুষ হিসেবে। কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজ থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে রয়েছে ধারাবাহিক সাফল্য। পাশাপাশি ক্রীড়াক্ষেত্রে আছে তাদের সাফল্য।
কোয়ান্টাম কসমো স্কুলের ব্যান্ড দল ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিশু-কিশোর সমাবেশের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের আনসার বাহিনীর পাশাপাশি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে কোনো স্কুল বাদকদল এ ব্যান্ড পরিবেশন করে। ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিশু-কিশোর সমাবেশের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের ব্যান্ড বাদনে নেতৃত্ব প্রদান করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোয়ান্টামদের পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেন এবং প্রথম স্থান অধিকার করে কোয়ান্টাম কসমো স্কুল।
এছাড়া অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নৃগোষ্ঠীগুলোর ঐতিহ্যবাহী পোশাক সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা রয়েছে। শিশুরা যেন সবাই সবার মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধার পাশাপাশি নিজস্ব ভাষা এবং সংস্কৃতি চর্চা করতে পারে, তার ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী সাংগ্রাই উৎসব এখানে পালন করা হয় যথাযোগ্য মর্যাদায়। এছাড়া প্রত্যেকের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় আয়োজন করা হয় বিভিন্ন প্রশিক্ষণ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ধর্মীয় ও সংস্কৃতি সম্প্রীতি, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ক্রামা, সনাতন, প্রকৃতিপূজারি, অগ্নি উপাসকসহ সব ধর্মের শিশুরা নিজ নিজ ধর্ম পালনের অবারিত সুযোগ পাচ্ছে এখানে। একই ছাদের নিচে সব ধর্মের ও ২০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের বেড়ে ওঠার এ উদাহরণ বাংলাদেশে আর কোথাও নেই। এমনকি পৃথিবীতেও এমন দৃষ্টান্ত বিরল।
এখানে শিশুদের শাশ্বত ধর্মীয় চেতনা, অর্থাৎ সব ধর্মের মূল শিক্ষাকে তাদের সামনে উপস্থাপনের জন্য রয়েছে নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রম ও মেডিটেশন। পেশাগত জীবনে সফল হওয়ার পাশাপাশি প্রত্যেকেই যেন একজন ভালো মানুষ হতে পারে, নিজের ও অন্যের কল্যাণ করতে পারে এজন্য আবাসিকের তত্ত্বাবধানে এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। প্রথাগত শিক্ষার বাইরে এ বিদ্যায়তনের শিক্ষার্থীরা যাতে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মানবিকতার চেতনার আলোকে আলোকিত হয়ে অনন্য মানুষরূপে গড়ে উঠতে পারে, সে লক্ষ্যে এখানে রয়েছে ব্যতিক্রমি কিছু শিক্ষা কার্যক্রম, যা অধ্যয়নরত এ সম্ভাবনাময় শিশুদের সুপ্ত শক্তির বিকাশ ঘটাচ্ছে শতধারায়। একদিকে যেমন রয়েছে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চর্চা; অন্যদিকে রয়েছে সুকুমারবৃত্তি বিকাশের নানা আয়োজন।
প্রতি মাসের শেষ শুক্রবার কসমো স্কুলে নিয়মিতভাবে আয়োজন করা হয় মাসিক অভিভাবক সমাবেশ। বছর শেষে আয়োজিত হয় বর্ণাঢ্য বার্ষিক অভিভাবক সমাবেশ। শিক্ষার্থীদের সাফল্য এবং কৃতী শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সম্মাননা প্রদানের জন্য এখানে থাকে বিশেষ আয়োজন

Leave a Reply