জ্ঞানের জন্য সরস্বতী

সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের মাঠ পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে। ৪ ফেব্রুয়ারি বিদ্যার দেবী সরস্বতী পূজার দিন ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে হলের মাঠে হাজির হয়েছিলেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী। অতিথি ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও এসেছিলেন অনেকে।
জগন্নাথের হলের শিক্ষার্থীরা খুব ভোরে ঘুম ভেঙে স্নান করে পাঞ্জাবি পরে এসেছিলেন অঞ্জলি দিতে। হাতে ফুল-বেলপাতা নিয়ে পুরোহিতের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা একত্রে পাঠ করলেন দেবী সরস্বতীর প্রণামমন্ত্র: ‘ওঁ সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে। বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যাংদেহী নমোস্তুতে।’
জগন্নাথ হলের মাঠের চারপাশে প্রতিটি বিভাগের উদ্যোগে আলাদাভাবে ৫৫টি পূজামণ্ডপ সাজানো হয়েছিল। সঙ্গে ছিল হলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্যোগে নির্মিত আরও তিনটি পূজামণ্ডপ।
দিনশেষে সন্ধ্যায় জগন্নাথ হলের প্রাঙ্গণটি সেজেছিল অপরূপ সাজে। চারদিকে আলোর ছড়াছড়ি। লেজার বিমের চোখ ধাঁধানো আলো আর সাউন্ডবক্সের মিউজিক—শান্ত, নিরিবিলি হলটিতে যারপরনাই প্রাণের সঞ্চার করেছিল। হলের পুকুরটির দিকে তাকাতেই দেখা গেল অপরূপ এক দেবীমূর্তি! ওমা, এ কি! প্রিয় শ্বেতহংস-সমেত স্বয়ং দেবী সরস্বতী পুকুরের মাঝখানে বীণা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন যে! বর্ণিল আলোকসজ্জা দেবী প্রতিমাকে আরও মায়াবতী করে রেখেছে। যেন এইমাত্র তিনি ভক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে জলের ভেতর থেকে উঠে এসেছেন! কিন্তু দেবীর শরীর বালুময় কেন? প্রতিমা তৈরির কাজটি করেছেন চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা। ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে তাঁরা প্রায় এক মাসের সাধনায় তৈরি করেছেন এই মূর্তি। চারুকলার শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা যায়, বালুর ভাস্কর্যের আদলে ককশিটের ওপর বালুর প্রলেপ দিয়ে শৈল্পিক মনের মাধুরী মিশিয়ে এই মূর্তি গড়া হয়েছে।
এবার মাঠ ঘুরে প্রতিমা দেখার পালা। পদার্থবিজ্ঞান পরিবারের সংগঠন এস এন বোস ফিজিকস অ্যাসোসিয়েশনের মঞ্চে দেবীমূর্তির পেছনে দেখা গেল একটি বড় হাবল টেলিস্কোপের ডামি প্রতিকৃতি। আইন অনুষদের পূজামণ্ডপের সামনে গিয়ে দেখা গেল, দেবীমণ্ডপটি তৈরি হয়েছে আদালত ভবনের আদলে। আর টুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মণ্ডপটি পুরোটাই কলাগাছ দিয়ে তৈরি। আইবিএ অনুষদের মণ্ডপটি যেন বিশাল এক বাঁশের তৈরি প্রাসাদ! আর ব্যবস্থাপনা বিভাগের তো দেবীমূর্তি থেকে মণ্ডপ—সবই বাঁশের চাটাই দিয়ে তৈরি! এ রকম সব বিভাগেরই রয়েছে স্ব স্ব বৈশিষ্ট্য।
স্ত্রী সেতু মিত্রের সঙ্গে প্রথমবার হলে পূজা দেখতে এসেছেন সরকারি কর্মকর্তা অনুপ মিত্র। তিনি বলেন, ‘আমার ভাগনে এই হলের ছাত্র। ওর আমন্ত্রণে এখানে এসে খুব ভালো লাগছে। এক স্থানে এত সরস্বতী পূজা বিশ্বের আর কোথাও হয় বলে আমার জানা নেই।’
পূজা দেখে ফিরছি যখন, তখন মাঝরাতেও হলটি জেগে আছে দর্শনার্থীদের প্রাণচাঞ্চল্য নিয়ে।
পূজার সার্বিক তত্ত্বাবধায়ন করা হলের প্রাধ্যক্ষ অসীম সরকার জানান, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপ্রাচীন জগন্নাথ হল তাঁর ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে প্রতিবছর এই পূজা উদ্যাপন করে থাকে। জাতিধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে এটি একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। বাণী অর্চনার একটাই শিক্ষা হোক—সব ভেদাভেদ ভুলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়া।’

Leave a Reply