‘ফিল্ম পলিটিক্স আগেও বুঝতাম না, এখনো বুঝি না’

 ঢাকাই সিনেমার নায়িকা তানহা তাসনিয়া। রফিক শিকদার নির্মিত ‘ভোলা তো যায় না তারে’ দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তার। এরপর শফিক হাসানের ছবি ‘ধূমকেতু’ দিয়ে অবস্থান পোক্ত করার চেষ্টা করেন তিনি। ৯ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পেতে যাচ্ছে জাকির হোসেন রাজু পরিচালিত ও তানহা অভিনীত ছবি ‘ভালো থেকো’। এতে নীলা চরিত্রে দেখা যাবে তাকে। তার সহশিল্পী জনপ্রিয় অভিনেতা আরিফিন শুভ

ছবিটিতে অভিনয় ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে ৬ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার দুপুরে প্রিয়.কমের সঙ্গে কথা বলেছেন তানহা।

প্রিয়.কম: অনেকটা হুট করেই সিনেমার নায়িকা বনে গেছেন আপনি। এরপর একটু একটু করে এগিয়ে চলা। আসছে শুক্রবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া পরিচালক জাকির হোসেন রাজুর নতুন ছবি ‘ভালো থেকো’ মুক্তি পেতে যাচ্ছে। এই ছবিতে আপনি অভিনয় করেছেন। কী রকম লাগছে?

তানহা তাসনিয়া: হ্যাঁ, অনেকটা হুট করেই নায়িকা হয়ে গিয়েছি। এরপর একটু একটু করে কাজ করে যাচ্ছি, শিখছি। আসছে শুক্রবার আমার মুভি ‘ভালো থেকো’ মুক্তি পাবে। এক কথায় এই ছবিতে অভিনয় করে কেমন লাগছে, বলতে হলে বলব, খুবই ভালো। আমি সম্মানিতবোধ করছি যে এত বড় একটা প্রোডাকশন হাউসের সিনেমাতে কাজ করতে পেরেছি। আরেকটি বিষয় হলো আরিফিন শুভর মতো একজন হিরোর সঙ্গে আমি কাজ করতে পেরেছি। বাংলাদেশের বড় একজন পরিচালক এ সিনেমাটি ডিরেকশন দিয়েছেন। অনেক সিনিয়র শিল্পী এ সিনেমাতে কাজ করেছেন। সবকিছু মিলিয়ে আমি সত্যিই সম্মানিতবোধ করছি।

প্রিয়.কম: ছবিটি এখন মুক্তির জন্য দরজায় কড়া নাড়ছে। এ নিয়ে চিন্তায় আপনার কী রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছে?

তানহা তাসনিয়া: এটা একদম সত্যি কথা। শুধু ঘুম নয়, সিনেমাটির টেনশনে আমার রাতের খাওয়া-দাওয়া কিংবা সবকিছুই উড়ে গিয়েছে। এমন টেনশন হয়েছিল যখন এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর রেজাল্ট ঘোষণার সময় ঘনিয়ে এলো, ঠিক তখন। কী না কী হয়, এই ভেবে। নিজের মধ্যে উত্তেজনার সাথে নারভাসনেস প্রতিনিয়ত কাজ করছে। তবে আমার যারা বন্ধুজন রয়েছেন, তারা আমাকে অনেক আশাবাদী করে তুলছেন। যদি রেজাল্ট ভালো হয়, তাহলে তো ভালো, যদি না হয়, তাহলে নিজের কাজের জায়গাটা আরও ডেভলপ করার চেষ্টা করব।

প্রিয়.কম: এ ছবির চরিত্রটা কেন পছন্দ হলো আপনার?

তানহা তাসনিয়া: এ ছবির চরিত্রটা ঠিক যেমন, বলতে পারেন আমি ব্যক্তি জীবনে তানহাও ঠিক তেমনই। রাগী, জেদি, পরিবারের খুব আদরের। নিজের সাথে মিল রয়েছে, যার কারণেই চরিত্রটি পছন্দ করা। শুধু নট অনলি যে আমার সঙ্গে চরিত্রটির মিল রয়েছে, বিধায় আমি কাজটি করেছি, যেকোনো সিনেমার লিড রোল যখন প্লে করার কথা বলা হবে, আর সে প্রজেক্টটি যদি ভালো হয়, তাতে কাজ না করার তো কোনো উপায় দেখছি না। চরিত্রগত জায়গা থেকে এক্সপেরিমেন্ট করার খুব ইচ্ছে। সেখান থেকেই কাজটি করা।

প্রিয়.কম: ‘ভালো থেকো’ ছবিটি আপনার ক্যারিয়ারে মনে রাখার মতো কাজ হতে চলেছে বলে মনে হয়?

তানহা তাসনিয়া: আমার তো মনেই হয় ভালো একটি কাজ হতে চলেছে। কারণ আমার খুব ইচ্ছে ছিলো জাকির হোসেন রাজু ও আরিফিন শুভর সঙ্গে কাজ করার। খুব ইচ্ছে ছিল বড় একটি প্ল্যাটফর্মে কাজ করার। আমার বিগত দুটি ছবিতে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ পাইনি। এ ছবিতে কিছুটা হলেও প্রমাণ করার সুযোগ থাকবে। এবং স্পেশাল একটা কাজ হয়ে থাকবে।

প্রিয়.কম: কয়েকবার ছবিটির মুক্তির তারিখ পরিবর্তন হয়েছে।  এতে করে দর্শকদের আগ্রহের জায়গায় ছবিটি নিয়ে কোনো কমতি থাকবে বলে কি মনে হয়?

তানহা তাসনিয়া: তারিখ পরিবর্তনের বিষয়গুলো আসলে অনিচ্ছাকৃতভাবেই হয়েছে। বিভিন্ন কারণ ছিল। কারণ একজন প্রযোজক সিনেমায় যে টাকা লগ্নি করে সিনেমাটি নির্মাণ করেন, তিনি তো সে টাকা ব্যাক চাইবেন। অ্যাট লিস্ট পুঁজিটা ফেরত আসে, তাহলে তারা সন্তুষ্ট হয়ে যায়। আমার জানা মতে, এ ধরনের কিছু কারণেই বেশ কয়েকবার ছবিটি মুক্তির তারিখ চেঞ্জ করা হয়েছে। দর্শক এ কারণে সাময়িক কনফিউজ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন আবার মনে হচ্ছে কনফিউশনের জায়গাটা আবার ঠিক হয়ে গিয়েছে।

প্রিয়.কম: আপনারা সিনেমাটির জন্য তেমন ক্যাম্পেইন করছেন না। সরাসরি দর্শকদের সঙ্গে কথাও বলছেন না। কারণটা কী?

তানহা তাসনিয়া: আমরা তো আমাদের মতো করে প্রচার করছিই। এখন যেটা হয়েছে, ক্যাম্পেইনটা মার্কেটিং টিমে যারা রয়েছেন, তাদের দিক থেকে ডিসাইড করা রয়েছে, কী করতে হবে। আমারা টিভি চ্যানেল, রেডিও, পত্রিকা, এফএম স্টেশনে গিয়ে সিনেমাটি নিয়ে কথা বলছি। সোশ্যাল মিডিয়াতে তো চলছেই। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি, যাতে সব শ্রেণির মানুষদের কাছে যাতে খবরটি পৌঁছায়। তবে আমার মনে হয়, আমাদের দেশের সিনেমার মার্কেটিং সিস্টেমটা আরও বেটার করা উচিত।

প্রিয়.কম: সিনেমাটির ভয়ংকর একটি দৃশ্যের কথা বলুন। কাজ করতে গিয়ে কি বেশ কষ্ট করতে হয়েছে?

তানহা তাসনিয়া: তেমন কেনো ভয়ংকর দৃশ্য ছিল না। আমার জন্য ভয়ংকর দৃশ্য ওটাই ছিল প্রথম দিনে শুটিংয়ে গিয়ে আরিফিন শুভকে বলতে হবে ভালোবাসার কথা। মনের কথা খুলে বলতে হবে। এটাই আমার জন্য ভয়ংকর একটা ব্যাপার ছিল। কারণ প্রথম দিনই এ ধরনের সিন করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমি কিছুতেই এ ধরনের ডায়লগগুলো দিতে পারছিলাম না। পরে শুভ ভাই, রাজু স্যার সবাই মিলে যখন আমাকে বলল দেন, আমি ঠিকঠাকভাবে কাজটি করতে পেরেছি। কষ্টের কাজ আমি সাঁতার পারি না। আবার পানির ফোবিয়া রয়েছে। কিন্তু একটি দৃশ্য রয়েছে সাঁতারের। সে দৃশ্যটি করতে গিয়ে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে এবং বেশ ভয়েরও ছিল।

প্রিয়.কম: সহশিল্পী হিসেবে শুভর কথা যদি বলতেন…

তানহা তাসনিয়া: তার সঙ্গে কাজ করতে পেরে আমি অনেক বেশি প্লিজড। সামনে আমি আরও কিছু প্রজেক্টে তার সঙ্গে কাজ করতে চাই। কারণ সে এত বড় একজন হিরো। কিন্তু তার মধ্যে কোনো ইগো কিংবা কোনো ধরনের অহমিকা নেই। খুবই ফ্রেন্ডলি। খুব কো-অপারেটিভ। কাউকে ভালো শিল্পী হতে হলে তাকে সবার আগে ভালো মানুষ হতে হবে, যেটি তার মধ্যে রয়েছে।

প্রিয়.কম: ‘ভালো থেকো’ দেখার পর দর্শক কতটা ভালো থাকতে পারবেন?

তানহা তাসনিয়া: আমি তো আশা করব, দর্শক ‘ভালো থেকো’ দেখার পর ভালো থাকবে। কারণ তারা তো ভালো কাজের জন্য অপেক্ষা করে এবং সাদরে সেটিকে গ্রহণ করে। আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপটের একটি গল্প। এটি তো পারিবারিক সেন্টিমেন্টের একটা ছবি। আমার মনে হয় সেদিক থেকে ভালো কিছু হতে যাচ্ছে।

প্রিয়.কম: আজকের দিনে সিনেমার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

তানহা তাসনিয়া: সিনেমা নির্মাণ করার পর প্রযোজক তার লগ্নিকৃত অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না, যেটা খুবই কষ্টদায়ক। আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে দেখতে পাচ্ছি, দুটি হিট সিনেমা তাদের লগ্নিকৃত টাকা এখনো ফেরত পায়নি। প্রফিট তো অনেক দূরে। এভাবে চলতে থাকলে বাকিরা আর কী-ই বা করবে। আমাদের ইন্ডাস্ট্রি কীভাবেই বা বেঁচে থাকবে? সরকারের এগিয়ে আসা উচিত। না হয়, বড় ধরনের জটিলতার মুখে পড়বে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি।

প্রিয়.কম: ক্যারিয়ারে নিজেকে কখনো হতাশ মনে হয়েছে?

তানহা তাসনিয়া: কয়েকটি ঘটনার কারণে বেশ কয়েকবার নিজেকে হতাশ মনে হয়েছে। আবার নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছি। আমি ফিল্ম পলিটিক্স আগেও বুঝতাম না, এখনো বুঝি না। যদিও আমি মানুষ চিনতে বরাবরই ভুল করি, যার কারণেই এমনটিই হয়। যখন দেখি ভালো মান কিংবা বাজেটের ছবিগুলো চলছে না, হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন হতাশা আরও বেশি বাড়তে থাকে। অনেক সময় ভাবি, এমন সময় ফিল্মে আসলাম, যখন ইন্ডাস্ট্রির খারাপ অবস্থা। তবে আমি আশাবাদী, এই সময়টা নিশ্চয়ই উতরে যাবে। আমরা সুন্দরভাবে কাজ করতে পারব।

প্রিয়.কম: নতুন বছরে দর্শকদের কাছে কী চাইবেন?

তানহা তাসনিয়া: ‘ভালো থেকো’ সম্পূর্ণ আমার সিনেমা। আমরা যারা নতুন আসছি, ইন্ডাস্ট্রিত কাজ করছি। দর্শকদের বলব, আপনারা যদি আমাদের সাপোর্ট করেন, পাশে থাকেন, আমরা আরও সামনে এগিয়ে যেতে পারব। আরও ভালো কাজ করতে পারব। কারণ আমরা শুধু কাজটি করতে পারি। জাজমেন্ট করার দায়িত্ব আপনাদের। এই সময়ে অনেক নায়িকাই কাজ করছেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে তো আমাকে মিলিয়ে লাভ নেই। কারণ তাদের কাজের সংখ্যা এবং অভিজ্ঞতা অনেক বেশি।

প্রিয়.কম: যদি বলি প্রেমিকা হিসেবে তানহা কেমন, আপনি কী বলবেন?

তানহা তাসনিয়া: সেদিক থেকে বলতে গেলে আমি খুবই রোমান্টিক একটা মেয়ে। তবে আমার একটি বাজে দিক আছে। আমি হুট করেই রেগে যাই। তখন আবার নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি না। তবে আমি চেষ্টা করি সেটা কন্ট্রোল করার। আদারওয়াইজ আমার মনে হয়, আমি একজন ভালো প্রেমিকা।

প্রিয়.কম: একজন প্রযোজকের সঙ্গে আপনার প্রেমের কথা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। আপনি একজন পেশাদার নায়িকা হিসেবে কী মনে করেন, কাজ পাওয়ার জন্য একজন নায়িকাকে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে পেশাগত সম্পর্কের বাইরে গিয়ে প্রযোজকের সঙ্গে ঠিক কী ধরনের সম্পর্ক মেনটেইন করতে হয়?

তানহা তাসনিয়া: দেখুন, প্রেম তো মানুষের জীবনে দৈনন্দিন ব্যাপার, একটা নরম্যাল ব্যাপার। একটা হিউম্যান বিহ্যাভিয়র। যার সাথে যার বোঝাপড়ার সম্পর্ক, সে তার সঙ্গেই রিলেশন কন্টিনিউ করছে। এটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। প্রেমটা ফ্যাক্ট না। দেখতে হবে প্রফেশনালি কোনো হ্যাম্পার হচ্ছে কি না। যদি পেশাগত জীবন আর ব্যক্তিগত জীবন এক করে ফেলে, তখন সেটি ভিন্ন দিকে রূপ নেয়। কেউ যদি দুটি ভিন্ন ভিন্ন লাইফ মেনটেইন করতে পারেন, সেটা খারাপ কিছু নয়। সবাই তো আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক।

Leave a Reply